Homeজাতীয়শীতের অতিথি পরিযায়ী পাখি ও বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজম: বদলে যাচ্ছে পর্যটনের ভবিষ্যৎ

শীতের অতিথি পরিযায়ী পাখি ও বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজম: বদলে যাচ্ছে পর্যটনের ভবিষ্যৎ

Share

বাংলাদেশের পর্যটন মানেই শুধু পাহাড়, নদী বা সমুদ্র, এই ধারণা এখন বদলাতে শুরু করেছে। প্রকৃতির আরেক নীরব অথচ দারুণ সুন্দর উপহার হলো পরিযায়ী পাখি। শীত এলেই হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে তারা আসে আমাদের হাওর, বিল, জলাভূমি আর গ্রামবাংলায়। এই পাখিরা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পর্যটনের ক্ষেত্রেও তৈরি করে বিশাল সম্ভাবনা। এই বিষয়টিকেই সামনে রেখে সম্প্রতি নড়াইলের পানিপাড়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে উঠে এসেছে পরিবেশ, পরিযায়ী পাখি ও টেকসই পর্যটনের নতুন ভাবনা।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুজহাত ইয়াসমিন স্পষ্ট করে বলেছেন, পর্যটন বলতে শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য নয়, জীববৈচিত্র্যও এর বড় অংশ। যেখানে পরিযায়ী পাখির সমাগম হয়, সেই এলাকাগুলো আন্তর্জাতিক মানে তুলে ধরতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন প্রচারণা পাবে এক নতুন গতি। বাস্তবতা হলো, বিদেশি পর্যটকরা এখন প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। তারা চায় পাখির ডাক শুনতে, খোলা আকাশের নিচে সময় কাটাতে, আর জীবন্ত প্রকৃতির অংশ হতে।

“পরিবেশ, পরিযায়ী পাখি ও প্রকৃতি কেন্দ্রিক পর্যটন: সহাবস্থানের কৌশল” এই শিরোনামে নড়াইল জেলার পানিপাড়া এলাকায় অবস্থিত অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনারটি। সেখানে বক্তারা একটাই কথা জোর দিয়ে বলেছেন, প্রকৃতি রক্ষা না করলে পর্যটন টেকসই হবে না। আর পরিযায়ী পাখিকে নিরাপদ না রাখলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।

নুজহাত ইয়াসমিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাখি সংরক্ষণ নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হলে শক্তিশালী প্রচারণা দরকার। বাস্তব ফুটেজ দিয়ে তৈরি মানসম্মত ভিডিও সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু বিশেষজ্ঞ নয়, সাংবাদিক আর সাধারণ মানুষের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আসলে আমাদের সবার মানবিক দায়িত্ব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরও উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যটন উন্নয়নই ভবিষ্যতের একমাত্র টেকসই পথ। পরিযায়ী পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে। পাখি নিধন বা পরিবেশ ধ্বংসের মতো অপরাধ ঠেকাতে সরকারের নির্ধারিত সেল রয়েছে এবং এসব বিষয়ে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

সেমিনারে উপস্থাপিত উপাত্তভিত্তিক প্রেজেন্টেশনটি ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো। বিশ্বজুড়ে বার্ডওয়াচিং ও পরিযায়ী পাখি–কেন্দ্রিক পর্যটন এখন ইকো-ট্যুরিজমের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল খাত। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বার্ডওয়াচিং ট্যুরিজম বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

শুধু তাই নয়, পরিযায়ী পাখি–কেন্দ্রিক পর্যটন বাজারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে যেখানে এই বাজারের আকার ছিল ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০৩৫ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৮.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়—এখানে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগ অপেক্ষা করছে।

বাংলাদেশে আছে নদী, হাওর, বিল, চর আর বিস্তীর্ণ জলাভূমি। এসব এলাকায় প্রতিবছর অসংখ্য পরিযায়ী পাখি আসে। যদি এই স্থানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশ সহজেই আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। বিদেশি বার্ডওয়াচাররা তখন শীতকাল এলেই বাংলাদেশকে তাদের ভ্রমণ তালিকায় রাখবে।

অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই রিসোর্ট স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বছরে প্রায় আট থেকে নয় মাস এখানে দেশি ও অতিথি পাখির এক অসাধারণ মিলন দেখা যায়। এই দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, পাখি শিকারিদের কারণে ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা কমছে। এই বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারিভাবে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়।

স্থানীয় সাংবাদিকরাও সেমিনারে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তারা বলেন, পরিযায়ী পাখি রক্ষায় সমাজের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পানিপাড়া গ্রাম এখন অনেকের কাছে “পাখির গ্রাম” নামে পরিচিত। এই পরিচিতি নড়াইলবাসীর জন্য গর্বের। কিন্তু এই গর্ব ধরে রাখতে হলে কার্যকর উদ্যোগ দরকার।

সভাপতির বক্তব্যে খবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটন গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। সরকার, বেসরকারি খাত আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পর্যটন সম্ভব নয়। তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুজহাত ইয়াসমিন । বিষেশ অতিথি ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা, সহযোগী অধ্যাপক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট, ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিস এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ট্রিয়াব) খবির উদ্দিন আহমেদ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইরফান আহমেদ।

এই সেমিনার শুধু একটি আলোচনা সভা নয়, বরং একটি দিকনির্দেশনা। পরিবেশ–সচেতন পর্যটন ভাবনাকে শক্তিশালী করতে এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও দরকার। পরিযায়ী পাখি রক্ষা মানে শুধু প্রকৃতি রক্ষা নয়, এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান আর দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। সঠিক পরিকল্পনা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশ খুব সহজেই ইকো-ট্যুরিজমের মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন