জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে যখন নানা আলোচনা, শঙ্কা ও গুঞ্জন চলছে, ঠিক তখনই অত্যন্ত পরিষ্কার ও দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সবাই নির্বাচনের পক্ষে এবং সেখানে নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার এই বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) গাজীপুর জেলা পরিদর্শনে যান সেনাপ্রধানসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সেনাপ্রধানের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
সভায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার সক্ষমতা আমাদের আছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সবাই আগ্রহী। এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে নির্বাচন বানচাল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তার এই বক্তব্যে বোঝা যায়, নির্বাচন নিয়ে যে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা বাধা মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে নির্বাচন প্রভাবিত করার সম্ভাব্য অপচেষ্টার বিষয়েও সতর্ক করেন। তিনি জানান, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা হতে পারে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, কিছু অপরাধী চক্র এ ধরনের অপকর্মে জড়াতে পারে, তবে সবাই এমন কাজ করবে না। যারা আইন ভাঙবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোটের দিন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী সরাসরি ব্যবস্থা নেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সেনাপ্রধান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যারা র্যাগিং করবে, ভয়ভীতি দেখাবে কিংবা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী অ্যাকশন নেবে।
আইনের আওতায় যতটুকু শাস্তির বিধান রয়েছে, অপরাধীরা ঠিক ততটুকুই শাস্তি পাবে—এমন বার্তাও দেন তিনি। এই বক্তব্য ভোটারদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, দিনে ও রাতে নিয়মিত বিভিন্ন অপারেশনের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীদের আটক করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অপরাধীরা যেন সবসময় ভয় ও আশঙ্কার মধ্যে থাকে, সেই পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
তার মতে, আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই—একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। এজন্য নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে।
বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এজন্য সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা তৈরি করতে হবে।
তিনি মাঠে মোতায়েন থাকা সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সবার দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়াতে হবে। কাউকে বসে থাকার সুযোগ নেই। সক্রিয় ও দায়িত্বশীল উপস্থিতিই ভোটারদের সাহস জোগাবে এবং নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, পরিদর্শনকালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, ঢাকা বিভাগের গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এ সময় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আইএসপিআর আরও জানায়, তিন বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি নাগরিকবান্ধব আচরণ বজায় রেখে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে তিন বাহিনীর প্রধান ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েন থাকা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এই সরাসরি তদারকির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মনোবল বাড়বে এবং দায়িত্ব পালনে আরও আত্মবিশ্বাসী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেনাপ্রধান ও তিন বাহিনীর প্রধানদের এই যৌথ বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

