Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজকাজিরাঙার বাইরেও একশৃঙ্গ গণ্ডার! ৩৫০০ বছর আগের চমকপ্রদ ভারতের ইতিহাস

কাজিরাঙার বাইরেও একশৃঙ্গ গণ্ডার! ৩৫০০ বছর আগের চমকপ্রদ ভারতের ইতিহাস

Share

একশৃঙ্গ গণ্ডার বললেই আজ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসমের কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের ছবি। সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তর, আর তার মাঝেই শান্তভাবে হেঁটে চলেছে বিশাল শরীরের সেই গণ্ডার।

কিন্তু জানলে অবাক হবেন, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগেও ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে ঘুরে বেড়াত এই একশৃঙ্গ গণ্ডার। কাজিরাঙা থেকে বহু দূরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে।

এই তথ্য শুধু গল্প নয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উঠে এসেছে ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। চলুন সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।

বর্তমান সময়ে ভারতে একশৃঙ্গ গণ্ডার বলতে আমরা প্রায় সবাই অসমকেই বুঝি। সত্যি বলতে কী, এখন ভারতে এই প্রাণীকে দেখতে হলে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানেই যেতে হয়। অসম এবং নেপালের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় এখনও এদের বসবাস রয়েছে।

বন দফতর দীর্ঘদিন ধরে এই বিরল প্রাণীটিকে রক্ষা করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। শিকার রোধ, আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারির ফলে আজ একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা কিছুটা হলেও বেড়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এক সময় এই গণ্ডারের বাস ছিল অনেক বিস্তৃত এলাকাজুড়ে।

অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না যে দক্ষিণ ভারতেও একসময় একশৃঙ্গ গণ্ডার ঘুরে বেড়াত। কারণ আজকের দিনে সেখানে এমন কোনও প্রমাণ চোখে পড়ে না। তবে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন চমকপ্রদ কিছু নিদর্শন।

তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরের কাছে একটি অঞ্চলে খনন কাজের সময় পাওয়া গেছে কিছু হাড়ের টুকরো। প্রথমে সাধারণ প্রাণীর হাড় মনে হলেও বিস্তারিত পরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন, সেগুলি একশৃঙ্গ গণ্ডারের পায়ের কাছের হাড়।

এই আবিষ্কারই পাল্টে দেয় ভারতের প্রাচীন প্রাণী ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা।

এই হাড়গুলোর বয়স নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন কার্বন ডেটিং পদ্ধতি। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনও জৈব বস্তু কত পুরনো তা জানা যায়।

পরীক্ষার ফল বলছে, এই হাড়গুলোর বয়স আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার বছর। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগে দক্ষিণ ভারতের এই অঞ্চলে একশৃঙ্গ গণ্ডার অবাধে বিচরণ করত।

এই তথ্য প্রমাণ করে, একসময় একশৃঙ্গ গণ্ডারের বিস্তার শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে এত বড় প্রাণীটি দক্ষিণ ভারত থেকে হারিয়ে গেল কীভাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে। ঘাসভূমি ও জলাভূমি কমে গেছে। মানুষের বসতি বেড়েছে, চাষাবাদ শুরু হয়েছে। বনাঞ্চল ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়েছে।

একশৃঙ্গ গণ্ডারের মতো বড় প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য দরকার বিস্তীর্ণ খোলা এলাকা আর প্রচুর খাবার। দক্ষিণ ভারতে এই পরিবেশ ধীরে ধীরে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

এই আবিষ্কার ভারতের প্রাচীন প্রাণী ইতিহাসে এক নতুন দিক খুলে দিয়েছে। এতদিন আমরা যেটাকে শুধু অসমকেন্দ্রিক প্রাণী বলে জেনে এসেছি, আসলে তার ইতিহাস অনেক বেশি বিস্তৃত।

যাঁরা মনে করেন ভারতে একশৃঙ্গ গণ্ডার শুধু অসমেই ছিল, তাঁরা বর্তমান সময়ের দিক থেকে ঠিক হলেও ইতিহাসের দিক থেকে পুরোপুরি সঠিক নন।

এই ধরনের গবেষণা আমাদের শেখায়, প্রকৃতি এবং প্রাণীর ইতিহাস কতটা পরিবর্তনশীল।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় চার হাজারের কাছাকাছি। সংখ্যাটা শুনতে ভালো লাগলেও বিপদের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

চোরাশিকার, আবাসস্থলের সংকট এবং মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষ আজও বড় সমস্যা। তাই বন দফতর এবং পরিবেশবিদরা সবসময় সতর্ক রয়েছেন।

কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান, পোবিতোরা এবং নেপালের চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণ্ডারদের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছে।

কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের পরিবেশ একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য আদর্শ। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ ঘাসভূমি, নদী, জলাভূমি এবং পর্যাপ্ত খাবার।

ব্রহ্মপুত্র নদের পলিমাটি এই অঞ্চলের ঘাসকে পুষ্ট করে। ফলে গণ্ডারদের খাবারের অভাব হয় না। এই কারণেই আজ কাজিরাঙা একশৃঙ্গ গণ্ডারের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের উপর নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

একশৃঙ্গ গণ্ডার শুধু একটি প্রাণী নয়। এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাস বহন করছে এই প্রাণী।

আজ আমরা যদি সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই গণ্ডারকে শুধু বইয়ের পাতায়ই দেখবে। তাই সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

প্রকৃতিকে বাঁচালে তবেই প্রাণীরা বাঁচবে। আর প্রাণীরা বাঁচলেই ইতিহাস বাঁচবে।

দক্ষিণ ভারতে একশৃঙ্গ গণ্ডারের অস্তিত্বের এই প্রমাণ আমাদের ভাবতে শেখায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি কতটা বদলে যায়, আর সেই পরিবর্তনের ছাপ কত গভীরভাবে ইতিহাসে রয়ে যায়।

আজ একশৃঙ্গ গণ্ডার দেখতে হলে আমাদের যেতে হয় অসমে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক সময় এই বিশাল প্রাণীটি ভারতের বহু প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। সেই ইতিহাস জানাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন