শুক্রবার রাত। দিনের ব্যস্ততা শেষ করে মানুষ তখন একটু শান্তিতে বসেছে। ঠিক সেই সময়ই আচমকা কেঁপে উঠল ভারতের রাজধানী দিল্লি। রাত ৯টা ৪২ মিনিটে অনুভূত এই ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় শহরজুড়ে। শুধু দিল্লিই নয়, কাশ্মীর ও পাঞ্জাব-এর বিভিন্ন এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৯। এই কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল আফগানিস্তান, যা ভৌগোলিকভাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। যদিও কেন্দ্র ছিল দূরে, তবুও এর প্রভাব বেশ জোরালোভাবেই অনুভূত হয় ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
কম্পন শুরু হতেই অনেকেই প্রথমে বুঝতেই পারেননি কী হচ্ছে। কেউ ভাবেন, হয়তো মাথা ঘুরছে, আবার কেউ মনে করেন পাশের বাড়িতে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়—এটা ভূমিকম্প।
অনেক বাসিন্দা দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসেন। কেউ লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন, কেউ আবার অফিস ছেড়ে হুড়মুড় করে বাইরে চলে আসেন। বড় বড় ভবনের ভেতরে থাকা কর্মীরাও নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত মানুষ যা করে, ঠিক তাই-ই হয়েছে—নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ রাখার জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। ফলে মুহূর্তেই এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, যদিও তা ছিল স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া।
ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি জানায়, এই ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচে। অক্ষাংশ ২৮.৬৮ ডিগ্রি উত্তর এবং দ্রাঘিমাংশ ৭৬.৭২ ডিগ্রি পূর্বে এর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে গভীরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত কম গভীরতায় ভূমিকম্প হলে তার কম্পন বেশি অনুভূত হয়। এই ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে—যদিও কেন্দ্র ছিল দূরে, তবুও কম গভীরতার কারণে এর প্রভাব বেশি ছড়িয়েছে।
ভালো খবর হলো, এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ভবন ধসে পড়া বা বড় দুর্ঘটনার মতো ঘটনা ঘটেনি, যা নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়।
তবে ছোটখাটো ফাটল, দেয়ালে চিড় বা আসবাবপত্র নড়েচড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা কিছু জায়গায় ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসব ঘটনা সাধারণত মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে দেখা যায়।
এই ঘটনার আগের দিনও দিল্লি ও আশেপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। নয়ডা, গুরুগ্রাম এবং হরিয়ানা-তেও কম্পন টের পাওয়া যায়।
সেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঝাজ্জর এবং এর মাত্রা ছিল ৪.৪। বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই ঝাজ্জর অঞ্চলকে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করে আসছেন।
একটানা কয়েকদিনের মধ্যে একাধিক কম্পন হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে।
এটা একটু সহজভাবে বোঝা যাক। পৃথিবীর ভেতরে অনেক বড় বড় প্লেট রয়েছে, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা সরে যায়। এই ধাক্কা লাগার সময়ই ভূমিকম্প তৈরি হয়।
ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের কারণে উত্তর ভারত ও হিমালয় অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। তাই এই এলাকায় মাঝেমধ্যেই কম্পন অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা-ও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই শহরও সিসমিক রিস্ক বা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
আইআইটি খড়গপুর ২০১৫ সালে একটি সমীক্ষা চালায়, যেখানে বলা হয়—কলকাতা সিসমিক জোন ৩ ও ৪-এর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। এর মানে হলো, মাঝারি থেকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা এখানে রয়েছে।
যদিও ৭.৭ বা ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে আশপাশের অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব কলকাতায় অনুভূত হতে পারে।
কলকাতার মাটির গঠন এবং ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শহরের নিচে থাকা প্লেটগুলো সবসময়ই সামান্য নড়াচড়া করে। এই নড়াচড়ায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই কম্পন অনুভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে গ্রেড ৩-এর মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ, এখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, এটা জানা খুব জরুরি। ধরো তুমি ঘরে বসে আছো, হঠাৎ সবকিছু কাঁপতে শুরু করল—তখন প্রথম কাজ হলো শান্ত থাকা।
টেবিল বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া ভালো। লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে নামা উচিত। বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় চলে যেতে হবে, যাতে মাথার ওপর কিছু পড়ে না।
এই ছোট ছোট বিষয়গুলো অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।

