Homeজাতীয়দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ: কেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শীর্ষে তারেক রহমান

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ: কেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শীর্ষে তারেক রহমান

Share

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশ-বিদেশে চলছে নানা আলোচনা, জল্পনা আর বিশ্লেষণ। ঠিক এই সময়েই যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট প্রকাশ করেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ, যেখানে বলা হয়েছে—বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।

এই প্রতিবেদন শুধু একটি পূর্বাভাস নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নিয়েও গভীর ইঙ্গিত বহন করে।

দ্য ইকোনমিস্ট তাদের সর্বশেষ সংখ্যায় উল্লেখ করেছে, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান একটি পরিচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্ত দাবিদার।

সাময়িকীটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি হবে গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া এক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সেই সময় তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড-এর নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং গণতন্ত্রে ফেরার একটি বড় সুযোগ। দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, সুষ্ঠু নির্বাচন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে সহায়ক হবে।

এই মূল্যায়ন নতুন নয়। এর আগেও টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে।

২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনা দ্য ইকোনমিস্ট বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি যখন ঢাকায় প্রবেশ করেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজারো সমর্থক ভিড় জমায়। সাময়িকীটির বর্ণনায়, বাসটি কয়েক মাইল পথ খুব ধীরে চলছিল, যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারে।


এই দৃশ্য অনেকের কাছে ছিল প্রতীকী। দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে তিনি যে জনসমর্থনের মুখোমুখি হয়েছেন, তা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচনকে পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক বলা যায় না। দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।

নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর গবেষক শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ দুই দশক ধরে অনেক মানুষের ভোটের কোনো বাস্তব মূল্য ছিল না। তবে এখন রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী ব্যানার, পোস্টার আর প্রচারণা চোখে পড়ছে, যা মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিচ্ছে।

এই নির্বাচন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য শেষ বড় দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। বিশ্লেষণে বলা হয়, অধিকাংশ মানুষ একমত যে এই সরকার অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ রাখা, যাতে ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে ফেরার ঝুঁকি কমে।

প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামী নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। দলটি দাবি করছে, তারা নির্বাচিত হলে সব নাগরিকের জন্য সংযত শাসন নিশ্চিত করবে। তবে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে তাদের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট আরও উল্লেখ করেছে, জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। পাশাপাশি, অতীতে দলটি কখনোই সংসদে ১৮টির বেশি আসন পায়নি, ফলে দেশ পরিচালনার মতো অভিজ্ঞতা তাদের আছে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।

এই সব রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, পরিস্থিতি তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।

সাময়িকীটি স্মরণ করিয়ে দেয়, বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, যিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

তারেক রহমান বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নির্বাচিত হলে বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।


তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের এবং প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এসব পরিকল্পনা দেশের পরিবেশ ও কৃষি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমান মনে করেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। তার ভাষায়, ট্রাম্প একজন বাস্তববাদী ও ব্যবসায়িক মানসিকতার মানুষ। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে।

তারেক রহমানের মতে, তার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভ চলাকালে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হবে।
একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান মনে করেন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে—যেসব সরকার জনগণের জন্য কার্যকর কর্মসূচি রাখে না, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। তার ভাষায়, প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি কখনোই দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না।
দেশে ফেরার পর থেকে তিনি মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে মিল রেখে অনেক কথাই বলেছেন। তবে এখনো অনেকেই সাবধানী, কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

সবশেষে দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা এই তারেক রহমানকে আগের চেয়ে ভিন্ন মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তার বক্তব্য, আচরণ এবং রাজনৈতিক কৌশলে এক ধরনের পরিণত ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে—বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আর সেই মোড়ের কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম, তারেক রহমান।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন