Homeনির্বাচনগুপ্ত কারা? মজলুমদের গুপ্ত বলায় কড়া জবাব দিলেন জামায়াত আমির

গুপ্ত কারা? মজলুমদের গুপ্ত বলায় কড়া জবাব দিলেন জামায়াত আমির

Share

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কথার লড়াই এখন খুব পরিচিত। কে কাকে কী বলল, সেটাই অনেক সময় বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এমন এক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কেরানীগঞ্জে দেওয়া এক জনসভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি সোজা ভাষায় বলেছেন, যারা নিজেরাই বছরের পর বছর আড়ালে ছিল, তারাই আজ মজলুমদের নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কথাটা সহজ, কিন্তু ইঙ্গিতটা গভীর।

ঢাকার কেরানীগঞ্জে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনী জনসভা ছিল বেশ সরব। সেখানে ডা. শফিকুর রহমান অতীত টেনে এনে বর্তমান রাজনীতির দ্বিচারিতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্নে অন্যকে দোষ দেওয়ার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা জরুরি। অনেকটা আয়নায় নিজেকে দেখার মতো ব্যাপার।

তিনি বলেন, অতীতে কে কী করেছে তা নিয়ে নানা কথা হয়। কখনো গুপ্ত, কখনো সুপ্ত— এমন শব্দ ব্যবহার করে একে অপরকে আঘাত করা হয়। কিন্তু এই অভিযোগের রাজনীতি দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। বরং এতে বিভ্রান্তি বাড়ে।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জুলাই মাসে প্রস্তাবিত সংস্কার ও গণভোটের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুরুতে কিছু দল গণভোটের বিরোধিতা করেছিল। আবার পরে চাপের মুখে এসে অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়। আগে বলা হয় গণভোট হবে, পরে বলা হয় নির্বাচন ছাড়া গণভোট হতে পারে না। এই দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থান জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, আগে গণভোট হলে পরিবেশ সুন্দর হতো, নির্বাচনও সুষ্ঠু হতো। কিন্তু দাবি মানার পরও যখন বলা হয় “আমরা গণভোট মানি না”, তখন সেটি আসলে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের লুকোচুরি। সাধারণ মানুষ এসব বোঝে। রাজনীতিতে চাপ এলে সত্য বেরিয়ে আসে, এটা নতুন কিছু নয়।

জামায়াত আমির তার বক্তব্যে একটি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। জনগণ আসলে কী চায়— নতুন বাংলাদেশ, নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা? তিনি বলেন, এতদিন চেঁচামেচি করার পর এখন যখন মানুষ সরাসরি জবাব চাইছে, তখন অনেকেই ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করেছে। বাস্তবতা হলো, জনগণের চাপ উপেক্ষা করা যায় না।

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি পরিচিত প্রবাদ ব্যবহার করেন, যার অর্থ খুব পরিষ্কার। একবার জনগণ কাউকে ধাক্কা দিলে, সেই ধাক্কার প্রভাব সহজে যায় না। এতে বোঝা যায়, রাজনীতিতে জনমতের শক্তি কতটা বড়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে কথা বলা অর্থহীন। যদি জুলাইয়ের দাবি না মানা হয়, তবে নির্বাচন নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় না। তিনি মনে করিয়ে দেন, জুলাই না হলে আগের ব্যবস্থার অধীনেই অনেক দেরিতে নির্বাচন হতো।

একদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচন চাওয়া, অন্যদিকে জুলাইয়ের দাবি অস্বীকার করা— এই দুই অবস্থান একসঙ্গে চলতে পারে না। রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা দরকার। কথায় ও কাজে মিল না থাকলে জনগণ তা মেনে নেয় না।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে জামায়াত আমির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি ছবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দল হিসেবে তারা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চান। চাঁদাবাজি থাকবে না, ব্যাংক লুটের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। শেয়ারবাজারে লুটপাটের সাহস কেউ দেখাবে না— এমন প্রতিশ্রুতি তিনি উচ্চারণ করেন।

এটা অনেকটা এমন, যেমন কেউ বলে তার ঘরটা পরিষ্কার করবে। কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। তবুও তিনি জোর দিয়ে বলেন, তারা এই লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, মা-বোনদের সম্মান নিশ্চিত করা হবে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি। এই কথাগুলো সাধারণ মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

কারণ সবাই চায় নিরাপদ সমাজ। কেউ চায় না তার সন্তান অনিরাপদে বড় হোক বা বৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলায় থাকুক। এই জায়গায় তার বক্তব্য মানুষের দৈনন্দিন চাওয়ার সঙ্গে মিলে যায়।

এই বক্তব্যের ভেতরে মূলত দুটি বার্তা স্পষ্ট। এক, রাজনীতিতে দ্বিচারিতা চলবে না। দুই, জনগণের চাওয়া উপেক্ষা করলে শেষ পর্যন্ত জবাব দিতে হয়। ডা. শফিকুর রহমান অন্য দলগুলোর দিকে আঙুল তুললেও একই সঙ্গে নিজের দলের অবস্থানও পরিষ্কার করতে চেয়েছেন।

রাজনীতিতে এমন বক্তব্য নতুন নয়, কিন্তু সময় ও প্রেক্ষাপটের কারণে এগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সামনে নির্বাচন, সংস্কার ও গণভোট— সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি এখন মোড় ঘোরানোর পথে। এই মুহূর্তে দেওয়া প্রতিটি কথা তাই বাড়তি ওজন নিয়ে সামনে আসে।

সব মিলিয়ে, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য শুধু অভিযোগ বা প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ধরনের প্রতিফলন। জনগণ কীভাবে তা গ্রহণ করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন