বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা তরুণ নেতৃত্বাধীন এই দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটের অংশ হয়েও আলাদা ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—জোট রাজনীতির ভেতরে থেকে এনসিপির এই প্রতিশ্রুতিগুলোর ভবিষ্যৎ কী, আদৌ কি সেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব?
ঢাকার গুলশানে আয়োজিত ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এনসিপি তাদের রাজনৈতিক দর্শন, সংস্কার ভাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলটি স্পষ্ট করেছে যে তারা কেবল নির্বাচনী সমঝোতায় আবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়েই মাঠে নেমেছে।
এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বারবার উল্লেখ করেছেন, এই অভ্যুত্থানই তাদের রাজনৈতিক চেতনার সূচনা। স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং সাংবিধানিক সংস্কার—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই এনসিপির পথচলা শুরু।
দলটির নেতারা মনে করেন, গত ১৬ বছরের শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই এনসিপির ইশতেহারে বিচার, জবাবদিহি ও সংস্কারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অনেকের কাছেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে থেকেও এনসিপি কেন আলাদা ইশতেহার দিল। এ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য পরিষ্কার। তার ভাষায়, এই ১১-দলীয় জোট মূলত একটি নির্বাচনী জোট। আদর্শিক প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।
এনসিপি মনে করে, আলাদা ইশতেহার দেওয়ার মাধ্যমে তারা জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারছে। এতে ভোটাররা বুঝতে পারছে, জোটে থাকলেও এনসিপি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সংস্কার এজেন্ডা থেকে সরে আসেনি।
এনসিপির ইশতেহার বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে দলটি বলছে, যদি ১১-দলীয় জোট সরকার গঠন করে, তাহলে সরকারের ভেতরে এনসিপির অংশীদারিত্ব থাকবে। সেই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই তাদের ৩৬ দফা ‘প্রায়োরিটি লিস্টে’ থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে এনসিপি শিখেছে যে সব দাবি একসঙ্গে আদায় করা কঠিন। তবুও সরকারে থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই তাদের কৌশল। সংস্কার, বিচার, দুর্নীতি দমন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানে জোটের মধ্যে ঐক্য থাকবে বলে এনসিপি আশাবাদী।
এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়। এটি মূলত একটি রাষ্ট্র সংস্কারের নকশা। এখানে বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং প্রতিরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, জুলাই সনদের বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে। একই সঙ্গে জুলাই গণহত্যা, শাপলা চত্বর, বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ সব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙার অঙ্গীকার করেছে এনসিপি।
ইশতেহারের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি। মন্ত্রী, এমপি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আয়-সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ, ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল চালু এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব এনসিপির সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি। তরুণদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে ‘ইউথ সিভিল কাউন্সিল’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনসিপির ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং মুদ্রাস্ফীতি ছয় শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, প্রথম পাঁচ বছর করমুক্ত সুবিধা এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো এবং উচ্চশিক্ষায় ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এনসিপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। এতে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে দূরত্ব কমবে বলে দলটি দাবি করছে।
স্বাস্থ্যখাতে এনআইডি-ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড, জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা জোন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথ সহজ করতে পারে।
এনসিপির ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নদী-খাল দখলমুক্ত করা এবং শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর রিজার্ভ ফোর্স গঠন, ড্রোন ব্রিগেড এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহার উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বিস্তৃত। প্রশ্ন থেকে যায়, জোট রাজনীতির বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য। তবে এনসিপি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা এটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে দেখছে।
এই ইশতেহার একদিকে যেমন তরুণদের আশা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ভাষা ও নতুন এজেন্ডার ইঙ্গিত দেয়। জামায়াত জোটে থেকেও এনসিপি যে নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে চাইছে, এই ইশতেহার তারই স্পষ্ট প্রমাণ। এখন শেষ কথা বলবে ভোটের রাজনীতি এবং ক্ষমতার বাস্তব সমীকরণ।

