মার্কিন রাজনীতি, গ্ল্যামার আর ক্ষমতার মেলবন্ধন মানেই মার-এ-লাগো। ২০২৬ সালকে বরণ করে নিতে ফ্লোরিডার এই ঐতিহাসিক ক্লাবে আবারও নজরকাড়া এক MAGA নববর্ষের পার্টি অনুষ্ঠিত হলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান শুধু একটি পার্টি নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা, আলোচনার জন্ম এবং শক্তিশালী প্রতীকীতে ভরা এক সন্ধ্যায় পরিণত হয়।
মার-এ-লাগোর নববর্ষ উদযাপন: রাজনীতি ও আভিজাত্যের মিলন
বুধবার রাতে মার-এ-লাগো ছিল আলো, ক্যামেরা আর উত্তেজনায় ভরপুর। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প উপস্থাপকের ভূমিকায় হাজির হন। অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য—সবকিছুতেই ছিল পরিকল্পিত আড়ম্বর।
মেলানিয়া ট্রাম্প সেই রাতে রূপালী রঙের এক দৃষ্টিনন্দন পোশাকে উপস্থিত হন। রূপালী খচিত লুবউটিন হিলের সঙ্গে তার পোশাক পুরো সন্ধ্যার ফ্যাশন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পরিচিত ক্লাসিক টাক্সিডোতেই স্বাচ্ছন্দ্য বেছে নেন।
নববর্ষের সংকল্পে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক শব্দের বার্তা
কালো গালিচায় হাঁটার সময় সাংবাদিকরা যখন নববর্ষের সংকল্প জানতে চান, ট্রাম্প এক কথায় উত্তর দেন—“শান্তি।” তিনি বলেন, “পৃথিবীতে শান্তি।” এই সংক্ষিপ্ত উত্তরই মুহূর্তে শিরোনাম হয়ে যায়।
বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। যদিও তিনি ইউক্রেনে মার্কিন সেনা পাঠানো বা ভেনেজুয়েলায় ড্রোন হামলায় সিআইএ-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যান। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেও তার বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—তিনি বিতর্কে নয়, উৎসবে মন দিতে চান।
সাংবাদিকদের এড়িয়ে পার্টিতে প্রবেশ
সংবাদমাধ্যমের ভিড়ের মধ্যে ট্রাম্প হালকা হাসি দিয়ে “ধন্যবাদ” বলেন। এরপর মেলানিয়ার হাত ধরে তিনি পার্টির ভেতরে প্রবেশ করেন। এই দৃশ্য অনেকের কাছেই ছিল প্রতীকী—একদিকে ক্ষমতা, অন্যদিকে ব্যক্তিগত বন্ধন।
MAGA পার্টিতে উপস্থিত প্রভাবশালী অতিথিরা
এই জমকালো নববর্ষের পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন MAGA ঘরানার বহু পরিচিত মুখ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র রুডি গিউলিয়ানি, কলম্বিয়া জেলার মার্কিন অ্যাটর্নি জিনাইন পিরো, মাইপিলোর সিইও ও সিনেট প্রার্থী মাইক লিন্ডেল এবং হলিউড পরিচালক ব্রেট র্যাটনার।
এছাড়া হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সচিব ক্রিস্টি নোয়েমের উপস্থিতিও নজর কেড়েছে। রাজনীতি, ব্যবসা ও বিনোদন—সব ক্ষেত্রের প্রভাবশালীরা এক ছাদের নিচে মিলিত হন।
ট্রাম্প পরিবারের উপস্থিতি ও পারিবারিক মুহূর্ত
ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, এরিক ট্রাম্প এবং ব্যারন ট্রাম্পকেও পার্টিতে দেখা যায়। মঞ্চ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়। ৩১ ডিসেম্বর তার ৪৮তম জন্মদিন হওয়ায় এই মুহূর্তটি পার্টিতে এক আবেগী ছোঁয়া যোগ করে।
নেতানিয়াহুর উপস্থিতি ও নিলামের উত্তেজনা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, যিনি এর আগেই মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, তাকেও পার্টিতে দেখা যায়। ভেতরে ঢুকে ট্রাম্প একটি বিশেষ নিলামে এমসি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
শিল্পী ভেনেসা হোরাবুয়েনার আঁকা যীশুর একটি চিত্রকর্ম নিলামে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত ছবিটি ২.৭৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ট্রাম্প মজা করে বলেন, আরও বেশি দামে বিক্রি হলে তিনি আরও খুশি হতেন।
ডে-কেয়ার জালিয়াতি কেলেঙ্কারি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
মাইক হাতে নিয়ে ট্রাম্প মিনেসোটার ডে-কেয়ার জালিয়াতি কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার চুরি হয়েছে। তার মতে, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় ও নিউ ইয়র্কে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই কেলেঙ্কারির গভীরে যাওয়া হবে এবং সবকিছু প্রকাশ্যে আনা হবে। এই বক্তব্যে বোঝা যায়, উৎসবের মাঝেও রাজনৈতিক আক্রমণ থেমে নেই।
রিয়েলিটি টিভি তারকা ও বিতর্কিত মুখদের উপস্থিতি
এই পার্টিতে নতুন রিয়েলিটি টিভি তারকাদের উপস্থিতিও ছিল। নেটফ্লিক্সের আসন্ন শো ‘মেম্বারস অনলি: পাম বিচ’-এর কাস্ট সদস্য হিলারি মুসার ও রোজালিন ইয়েলিনের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
এছাড়া ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত লরা লুমারও উপস্থিত ছিলেন। তিনিই প্রথম জানিয়েছিলেন যে নেতানিয়াহু এই উৎসবে যোগ দেবেন।
আতশবাজি ও সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলক
মঞ্চে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে না দিলেও, পরে পাম বিচে দুজনকে একসঙ্গে আতশবাজি উপভোগ করতে দেখা যায়। সেই দৃশ্য দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
মার-এ-লাগোর নববর্ষ ঐতিহ্যের ইতিহাস
মার-এ-লাগোর নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে। ট্রাম্প যখন এই জলপ্রান্তের ঐতিহাসিক ভবনটিকে একটি ব্যক্তিগত ক্লাবে রূপান্তর করেন, তখন থেকেই এই পার্টি হয়ে ওঠে অভিজাত সমাজের অন্যতম আকর্ষণ।
গত তিন দশকে এখানে উপস্থিত ছিলেন মার্থা স্টুয়ার্ট, সেরেনা উইলিয়ামস, সিলভেস্টার স্ট্যালোন, রেজিস ফিলবিন, জেসন অ্যাল্ডিয়ান ও টাইগার উডসের মতো তারকারা। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেলিব্রিটির সংখ্যা কমে, MAGA ঘরানার নেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে।
সদস্যপদ, খরচ ও একচেটিয়া পরিবেশ
মার-এ-লাগোর সদস্যরা প্রত্যেকে দুজন অতিথি আনার সুযোগ পান। তবে নববর্ষের পার্টির জন্য আলাদা খরচ দিতে হয়, যা কয়েক হাজার ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। এই উচ্চমূল্যই পার্টিটিকে আরও একচেটিয়া করে তোলে।
মার-এ-লাগো নিয়ে রোনাল্ড কেসলারের অভিজ্ঞতা
বেস্টসেলার লেখক রোনাল্ড কেসলার তার বই ‘দ্য সিজন: ইনসাইড পাম বিচ অ্যান্ড আমেরিকা’স রিচেস্ট সোসাইটি’-এর গবেষণার সময় মার-এ-লাগো ও ট্রাম্পের খুব কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি জানান, নববর্ষের সময় এখানে প্রবেশের জন্য শত শত অনুরোধ আসে।
১৯৯৮ সালের এক পার্টির স্মৃতিচারণায় ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, রড স্টুয়ার্ট, হুইটনি হিউস্টন, সেলিন ডিওন থেকে শুরু করে অসংখ্য তারকা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় মেলানিয়া নাউস ছিলেন তার সঙ্গী। পরে সেই সম্পর্কই দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্যে রূপ নেয়।
উৎসবের আড়ালে রাজনৈতিক বার্তা
মার-এ-লাগোর এই MAGA নববর্ষের পার্টি শুধু ঝলমলে পোশাক বা আতশবাজির গল্প নয়। এটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের শক্তি প্রদর্শন, রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা এবং নিজের ব্র্যান্ডকে আরও দৃঢ় করার এক মঞ্চ। মেলানিয়া ট্রাম্পের নীরব কিন্তু দৃশ্যমান উপস্থিতি আর ট্রাম্পের এক শব্দের “শান্তি” বার্তা—সব মিলিয়ে এই রাত ২০২৬ সালের রাজনীতির ইঙ্গিতবাহী সূচনা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

