Homeআবহাওয়াজানুয়ারিতে দেশজুড়ে ৪-৫টি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা: ঘন কুয়াশা, তীব্র শীত ও জনজীবনে বাড়তি...

জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ৪-৫টি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা: ঘন কুয়াশা, তীব্র শীত ও জনজীবনে বাড়তি দুর্ভোগ

জানুয়ারির শুরু থেকেই শৈত্যপ্রবাহের দাপট থাকবে। মাঝেমধ্যে শীত কিছুটা কমলেও আবার হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। ঘন কুয়াশা সকাল পর্যন্ত থাকতে পারে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করবে।

Share

বাংলাদেশের শীত এবার যেন চেনা ছকের বাইরে চলে গেছে। পৌষ মাস পেরোতেই ঠান্ডার তীব্রতা এমনভাবে বেড়েছে যে অনেকেই বলছেন, এমন শীত বহু বছর দেখা যায়নি। রাতের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে, দিনের বেলা সূর্যের দেখা মিলছে খুব কম। চারদিকে ঘন কুয়াশা, সঙ্গে হিমেল বাতাস—সব মিলিয়ে পুরো দেশ এখন শীতের চাদরে মোড়া।

এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, জানুয়ারি মাসজুড়ে দেশজুড়ে ৪ থেকে ৫টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে কয়েকটি হবে মাঝারি মাত্রার, আবার অন্তত একটি শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে অত্যন্ত তীব্র। ফলে সামনে আরও কিছুদিন শীতজনিত ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানুয়ারির শৈত্যপ্রবাহ: কী বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো ঠিকমতো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে না। এ কারণেই শীতের অনুভূতি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, জানুয়ারিতে শীত কখনো কমবে, কখনো আবার হঠাৎ বেড়ে যাবে। এই ওঠানামার মধ্য দিয়েই পুরো মাস কাটতে পারে।

ঢাকায় সম্প্রতি তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাত্র ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শীতের স্থায়িত্ব হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু তীব্রতা এবার বেশি অনুভূত হচ্ছে।

কোন কোন জেলায় বেশি প্রভাব পড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় ঠান্ডা বাতাস আর ঘন কুয়াশায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের দাপট বেশি।

কুড়িগ্রামে তাপমাত্রা নেমে এসেছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। জয়পুরহাট, পঞ্চগড় ও বরিশালেও হাড় কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে। পঞ্চগড়ে শীতার্ত মানুষের কথা বিবেচনা করে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।

ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা

শীতের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘন কুয়াশা। এর প্রভাব পড়ছে বিমান, সড়ক, রেল ও নৌপরিবহণে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সড়ক ও মহাসড়কে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। রেলপথেও ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচলে স্থবিরতা

ঘন কুয়াশার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে। পদ্মা নদীর অববাহিকায় কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ১২ ঘণ্টা বন্ধ ছিল ফেরি চলাচল। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুয়াশা এতটাই ঘন হয়ে যায় যে চ্যানেলের বিকন বাতি ও মার্কিং পয়েন্ট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।

নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে ঘাট কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী শতাধিক যানবাহন দৌলতদিয়া প্রান্তে আটকে পড়ে। তীব্র শীতের মধ্যে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

রোববার বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব কিছুটা কমলে পুনরায় ফেরি চলাচল শুরু হয়। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানান, কুয়াশা কমায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে এবং বড় কোনো যানজট দেখা যায়নি।

শীতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা

এই তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। ঠান্ডাজনিত রোগ যেমন সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে এসব রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের সময় সুষম খাদ্য গ্রহণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত গরম পোশাক ব্যবহার করা খুব জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

কৃষিতে শীতের নেতিবাচক প্রভাব

শৈত্যপ্রবাহের কারণে কৃষকরাও পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কৃষকরা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত ঠান্ডায় ইরি ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে সামনে ধান রোপণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাস ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে। সবজি চাষেও প্রভাব পড়ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও ক্ষেত ব্যবস্থাপনায় বাড়তি যত্ন নিলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।

সামনে কী ধরনের আবহাওয়া হতে পারে

সব দিক বিবেচনায় আবহাওয়াবিদদের ধারণা, জানুয়ারির শুরু থেকেই শৈত্যপ্রবাহের দাপট থাকবে। মাঝেমধ্যে শীত কিছুটা কমলেও আবার হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। ঘন কুয়াশা সকাল পর্যন্ত থাকতে পারে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করবে।

তাই সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অপ্রয়োজনে ভোরে বা গভীর রাতে যাত্রা এড়িয়ে চলা, শিশু ও বৃদ্ধদের উষ্ণ রাখা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে ভালো উপায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের জানুয়ারি শীতের দিক থেকে বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। শৈত্যপ্রবাহ, কুয়াশা আর ঠান্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই সামনে এগোতে হবে দেশবাসীকে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন