দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় একশ’ পুরস্কার জয় করেছে ইউসরা মানহা। আসন্ন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় এই অদম্য মেধাবীর শ্রুতিলেখক নিয়ে চলছে দুই আইনের ঠেলাঠেলি। আর এতেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার বৃত্তি পরীক্ষা।
প্রায় এক মাস সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ধর্ণা দিয়েও বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন মানহার বাবা-মা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার আর মাত্র ১২ দিন বাকী থাকায় তারা শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেধাবী ইউসরা মানহা যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ও যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার আসকার সালমান ও সুমনা ফেরদৌসের সন্তান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখাপড়ার পাশাপাশি সে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে।
স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রায় একশ’ পুরস্কার অর্জন করেছে। মানহার বাবা আসকার সালমান জানান, মানহা ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। আগামী ১৫ এপ্রিল এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। যেহেতু মানহা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তাই প্রায় একমাস আগে তার শ্রুতিলেখকের জন্য আবেদন করা হয়।
শ্রুতিলেখকের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক এর সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ রয়েছে। এই নীতিমালায় উল্লেখ আছে, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর ধারা ১৬ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ঝ) ও (ড) অনুযায়ী সকল পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।’

এই নীতিমালা অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য শ্রুতিলেখকের সর্বোচ্চ যোগ্যতা একজন শিক্ষক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখকের জন্য আবেদন করা হলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ওই আবেদন গ্রহণ করেনি। এর বিপরীতে তারা প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা ২০২৬ দেখিয়ে দিয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক হিসেবে ৪র্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে নেওয়া যাবে।
আসকার সালমান আরও জানান, আমরা যখন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছি ২৬ সালের এই পরীক্ষায় ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলতে বোঝায় সদ্য তৃতীয় শ্রেণি উত্তীর্ণ শিশু। সে কিভাবে ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক হতে পারে।
সে তো অনেক শব্দ, বানান, বাক্য বুঝবেই না। পাশাপাশি এই শিশু শ্রুতিলেখকের মানসিক পরিপক্বতাও তো বুঝতে হবে। এজন্য আমরা আবেদন করেছিলাম ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ বিবেচনায় নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নীতিমালাকে বিবেচনায় নিতে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেটি ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, প্রাথমিকের নয়’ বলে উল্লেখ করে আমাদের কোনো কথাই শুনতে চাননি।
অথচ ওই নীতিমালায় কিন্তু প্রাথমিকের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। মানহার মা সুমনা ফেরদৌস বলেন, মানহা তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। কুইজ, আবৃত্তি, সঙ্গীতসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ধারায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে প্রায় একশ’ পুরস্কার জয় করেছে।
এই মেয়েটির বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নীতিমালা মেনে আমরা তার স্কুলের একজন শিক্ষককে শ্রুতিলেখক হিসেবে আবেদন করেছিলাম। বিষয়টি নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে একমাস ধরে ধর্ণা দিয়েছি।
কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দুই নীতিমালার দোহাই দিয়ে কোনো সুরাহা করেনি। আর এই সঙ্কট তো শুধু একটি শিশুর নয়; আরও অনেক শিশুকেই এই সমস্যার পড়তে হচ্ছে। তাই বিষয়টির সুরাহার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

এ ব্যাপারে জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিএম আলমগীর কবির জানান, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা ২০২৬’ রয়েছে। এই নীতিমালার বাইরে যেয়ে তাদের কিছু করার নেই।
তবে এ ব্যাপারে জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা মুনা আফরিণ জানান, ‘অদম্য মেধাবী মনহা অসংখ্য পুরস্কার জিতে তার মেধা-প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তার শ্রুতিলেখক নিয়ে এই ঠেলাঠেলি আমাকে মর্মাহত করেছে।
অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ কার্যকর হবে। এই আইন মেনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ নীতিমালা করেছে।
অথচ আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতার কারণে প্রাথমিক বিভাগ ওই নীতিমালা মানছে না। এটি একজন প্রতিবন্ধী শিশুর অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে আমি মানহার জন্য ন্যায় চাই।’






